সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাঁ, আলীকদম (বান্দরবান):

‎মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। বসানো হয়েছে খুঁটিও। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, পাহাড়ি এই গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিদ্যুতের মূল লাইন থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে নেই সংযোগ। ফলে সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো এলাকা। কারও ভরসা সোলার প্যানেল, কারও চেরাগ; আবার কারও ঘরে আলো জ্বলে মুঠোফোনের টর্চে।

‎বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ৩নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের যোগেন্দ্র পাড়া,বসুদেব পাড়া,সাইয়ে ম্রো পাড়া, রোহিনীমোহন কারবারী পাড়াসহ পাঁচটি গ্রামের চিত্র এটি। শত বছরের পুরোনো এসব পাড়ায় বসবাস করছেন তিন শতাধিক পরিবার। অধিকাংশ মানুষ জুমচাষ ও দিন মজুরির ওপর নির্ভরশীল।

‎ঘরের ভেতরে মুঠোফোনের আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় চার বছর বয়সী শিশু পমি তংচঙ্গ্যার মুখ। এক হাতে মুঠোফোন,অন্য হাতে ভাতের লোকমা। মায়ের হাত থেকে খাবার তুলে নিচ্ছে শিশুটি। অথচ ঘরের বাইরে তাকালেই দেখা যায়, মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। কিন্তু সেই তারের আলো পৌঁছায়নি ঘরের ভেতরে।

‎এভাবেই প্রতিদিন অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করছেন সঞ্জিতা তংচঙ্গ্যা। তিনি বলেন, “গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি আর কারেন্ট এসেছে। কিন্তু বিদ্যুতের লোকজন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করায় লাইন আনতে পারিনি। আমরা গরিব মানুষ,টাকা-পয়সা নেই। এত টাকা কোথা থেকে দেব? এ কারণে মোবাইলের লাইট দিয়েই থাকতে হচ্ছে।”

‎শুধু বসতঘর নয়,বিদ্যুতের সংযোগ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসাও। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে অংচিংনু তংচঙ্গ্যার ছোট্ট দোকান। দুই বছর ধরে সোলারের আলোয় ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তিনি। দোকানের সামনে বিদ্যুতের খুঁটি ও মূল লাইনের তার থাকলেও এখনো পৌঁছায়নি সংযোগ।

‎অংচিংনু তংচঙ্গ্যা বলেন, “আমার দোকান থেকে ১০০ গজ দূরে বিদ্যুতের খুঁটি ও আলো দেখা যায়। কিন্তু এখানে বিদ্যুতের লাইন বা খুঁটি দেওয়া হয়নি। বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীরা টাকা দাবি করছেন।”

‎সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নয়াপাড়া ইউনিয়নের এসব পাড়ায় ভোর হলেই শুরু হয় মানুষের কর্মব্যস্ততা। কেউ পাহাড়ের ঢালে জুমের কাজে বেরিয়ে পড়েন, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঘরের কাজে। দিনভর পাহাড়ে শ্রম দেওয়ার পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেও তখন শুরু হয় আরেক সংগ্রাম—ঘরে আলো জ্বালানোর সংগ্রাম।

‎স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপনের জন্য পাড়াবাসীর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে খুঁটি স্থাপন করা হয় এবং মূল বিদ্যুতের লাইনও চলে যায় এলাকার ওপর দিয়ে। কিন্তু বাড়িঘরে সংযোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শাখা-প্রশাখা লাইন স্থাপন করা হয়নি।

‎তাদের অভিযোগ, শাখা লাইন ও মিটার স্থাপনের জন্য আবারও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অধিকাংশ পরিবার বিদ্যুতের সংযোগ নিতে পারছে না।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ২০০টি বাড়িঘরের মধ্যে মাত্র চারটি বাড়িতে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। অন্য বাড়িগুলোতে এখনো সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও চেরাগই একমাত্র ভরসা। কোনো কোনো ঘরে মুঠোফোনের টর্চ জ্বালিয়েও প্রয়োজনীয় কাজ করতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের অনেকেই সোলারের ক্ষীণ আলোয় পড়াশোনা করছে।

‎যোগেন্দ্র কারবারী পাড়ার চিংচাহ্লা তংচঙ্গ্যা বলেন, “গ্রামে বিদ্যুৎ আনতে ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে কর্মচারীদের। এরপর বিদ্যুৎ এলেও শাখা-প্রশাখা লাইন দেওয়া হয়নি। এখন শাখা লাইন দিতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করছে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন। এ কারণে অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।”

‎রঞ্জন তংচঙ্গ্যা বলেন, “বিদ্যুতের মিটার আর শাখা-প্রশাখা নিতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে বলা হচ্ছে। এখানে সবাই গরিব, দিনে এনে দিনে খায়। এত টাকা কীভাবে দেবে? মাত্র চারটি বাড়িতে বিদ্যুৎ জ্বলছে। অন্য বাড়িগুলোতে এখনো সোলার ও চেরাগের আলোতে দিন কাটাতে হচ্ছে।”

‎নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, “২০২৪ সালে যোগেন্দ্র পাড়ায় বিদ্যুতের তার গেছে। কিন্তু শাখা-প্রশাখা লাইন না থাকায় অনেকেই বিদ্যুৎ নিতে পারছেন না। আর মিটার নিতে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন টাকা চাইছে—এমন অভিযোগও স্থানীয়রা করেছেন।”

‎তবে টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার না করে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন লামা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, “কেউ টাকা চাইলে আমার অফিসে এসে যোগাযোগ করলে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পাড়াবাসী তো অফিসে আসেন না। তাছাড়া আমি ওই এলাকার নাম শুনেছি, এখনো সেখানে যাওয়া হয়নি। যদি বিদ্যুৎ লাইন বা শাখা-প্রশাখা দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।”

‎কোনো কর্মচারী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য টাকা চাইলে সরাসরি অফিসে এসে অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎বিদ্যুতের খুঁটি আছে, মাথার ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তারও গেছে—শুধু ঘরে পৌঁছায়নি আলো। তাই উন্নত জীবনের আশায় থাকা এসব পাহাড়ি পরিবারের সন্ধ্যা এখনো কাটে সোলারের ক্ষীণ আলো, চেরাগ কিংবা মুঠোফোনের টর্চে। বিদ্যুতের অবকাঠামো চোখের সামনে থাকলেও আলো পাওয়ার অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না তাদের।